নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উপকূলীয় জেলা বরগুনা বছরের পর বছর উন্নয়ন বঞ্চনার চক্রে আটকে আছে।
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এসেছে বারবার, কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে অধিকাংশ বড় প্রকল্পই হারিয়ে গেছে কিংবা স্থানান্তরিত হয়েছে পাশের জেলা পটুয়াখালীসহ অন্যত্র। ফলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান বাড়ছে, আর গভীর হচ্ছে মানুষের হতাশা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বরগুনার জন্য ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত অন্য জেলায় বাস্তবায়িত হয়েছে। বরগুনায় সেনা ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেও সরিয়ে নেওয়া হয়। একইভাবে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন হয়েছে পটুয়াখালীতে। অথচ ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্যোগপ্রবণতা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে বরগুনাই ছিল অধিক উপযোগী-এমন মত স্থানীয় সচেতন মহলের।
তালতলীতে ঘোষিত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হয়েছে পটুয়াখালীর আন্দারমানিক নদীতে। তালতলীতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং পাথরঘাটায় পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপনের উদ্যোগও বাস্তবায়নের আগেই থেমে গেছে।
যোগাযোগ অবকাঠামোতেও বরগুনা পিছিয়ে। বরগুনা-বাকেরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের অর্ধশতাধিক বিপজ্জনক বাঁক প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পায়রা ও বিষখালী নদীর ওপর প্রতিশ্রুত সেতুর কাজ দৃশ্যমান না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে।
অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি কৃষি ও মৎস্য হলেও এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এক মৌসুমের বেশি ফসল উৎপাদন সম্ভব না হওয়ায় কৃষিতে বৈচিত্র্য আসেনি। অন্যদিকে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে বিদেশি জেলেদের অনুপ্রবেশ স্থানীয় জেলেদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরদারি জোরদারের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকর অগ্রগতি নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেকেই মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে বরগুনার রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন বরগুনা-১ আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং বরগুনা-২ আসনের সাবেক এমপিগণ- গোলাম সবুর টুলু, শওকত হাচানুর রহমান রিমন ও সুলতানা নাদিরা। তারা সবাই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি ছিলেন। তবে স্থানীয়দের মতে, কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা ও উদাসীনতার কারণে বহু মেগা প্রকল্প বরগুনায় বাস্তবায়নের সুযোগ হারায় এবং পার্শ্ববর্তী জেলা তা কাজে লাগায়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পর বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ নুরুল ইসলাম মণি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, যা জেলার জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে বরগুনা-১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহর প্রতিও উন্নয়নের প্রত্যাশা বাড়ছে। অন্যদিকে জেলা পরিষদ প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বরগুনা জেলা বিএনপির আহবায়ক মোঃ নজরুল ইসলাম মোল্লার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সচেতন মহলের মতে, বর্তমান নেতৃত্ব যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন, তবে বরগুনার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফেরা সম্ভব। উপকূলের এই জনপদের মানুষের একটাই দাবি- ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন। কার্যকর উদ্যোগ নিলে বরগুনা শুধু নিজেই এগোবে না, বদলে দিতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্য ও শিল্পের চিত্র। এখন দেখার বিষয়- প্রতিশ্রুতির সীমা পেরিয়ে বাস্তব উন্নয়ন কবে পৌঁছায় বরগুনার মানুষের দোরগোড়ায়।